কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উদ্যোক্তা, গণমাধ্যম ও সামাজিক কর্মকাণ্ড—তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তরুণ উদ্যোক্তা মোঃ মোহতাসিম বিল্লাহ। গণমাধ্যমকে মানুষের কথা বলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
মোহতাসিম বিল্লাহর উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ প্রথম ডিজিটাল মিডিয়া লিমিটেড (প্রথম টিভি)। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। কুড়িগ্রামকে কেন্দ্র করে যাত্রা শুরু করা এ গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্থানীয় সংবাদ, জনদুর্ভোগ, সামাজিক সমস্যা, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি নিজস্ব ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার উদ্যোগকে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথম টিভির কার্যক্রমের পরিধি কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিধি ও সংবাদকর্মী যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

মোহতাসিম বিল্লাহর কর্মপরিসর শুধু গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি SK Courier Service-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। কুড়িগ্রাম থেকে কুরিয়ার সেবাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য পরিবহন ও পার্সেল ডেলিভারি সেবা সহজ করার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ই-কমার্স খাতেও রয়েছে তাঁর উদ্যোগ। Moventra Online Shop নামে একটি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়িক উদ্যোগ পরিচালনা করছেন তিনি। বিভিন্ন ধরনের পণ্য অনলাইনে বিক্রি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের মাধ্যমে ডিজিটাল বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা রয়েছে এ উদ্যোগে।

ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হয়েছেন মোহতাসিম বিল্লাহ। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত Green Life Social Welfare Foundation বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রক্তদান, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, শিক্ষা সহায়তা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্রাণ বিতরণ, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সংগঠনটির মাধ্যমে।
বিশেষ করে তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে সামাজিক উদ্যোগগুলো পরিচালনার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে সংগঠনটির।

মোহতাসিম বিল্লাহর কাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো একাধিক খাতে একই সময়ে উদ্যোগ নেওয়া। গণমাধ্যম, ই-কমার্স, কুরিয়ার ও সামাজিক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও যুক্ত করা প্রয়োজন।
তবে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর পথচলা পুরোপুরি মসৃণ নয়। নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, গণমাধ্যম পরিচালনা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি তাঁর জন্য বড় বাস্তবতা। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গণমাধ্যম পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালে তাঁকে ঘিরে হুমকি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির অভিযোগের বিষয়ও সামনে আসে। এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে অভিযোগগুলো তাঁর পক্ষ থেকে করা দাবি হিসেবে বিবেচিত; এগুলোর সত্যতা নির্ধারণ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়।
মোহতাসিম বিল্লাহর শিক্ষাজীবনও বহুমুখী। তিনি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ইসলামিক স্টাডিজ ও আইন বিষয়ে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পেশাগত কাজের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

কুড়িগ্রামের মতো একটি সীমান্তবর্তী জেলা থেকে একজন তরুণের একাধিক খাতে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনার কথাও সামনে আনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগগুলো টেকসই করতে প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, আর্থিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল।
মোহতাসিম বিল্লাহর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর নেওয়া উদ্যোগগুলোকে ব্যক্তিনির্ভরতার বাইরে এনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। পাশাপাশি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকতার নীতিমালা, তথ্য যাচাই ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পাঠকের আস্থা অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কুড়িগ্রাম থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই বহুমুখী উদ্যোগ ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে গণমাধ্যম, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে একই কর্মপরিসরে নিয়ে আসার যে চেষ্টা তিনি করছেন, তা তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ তৈরির একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে।