কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ হলরুমে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, বাংলাদেশ-এর কুড়িগ্রাম জেলা শাখার পরিচিতি পর্ব, প্রশিক্ষণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত সভায় সাংবাদিকতার আইনগত দিক, পেশাগত নৈতিকতা, মানবাধিকার, তথ্যের গোপনীয়তা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোঃ খায়রুল আলম রফিক। এ সময় প্রশাসন, পুলিশ ও তথ্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথি, সাংবাদিক এবং সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে মোঃ খায়রুল আলম রফিক সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইনগত বিষয় তুলে ধরেন। কোন ধরনের সংবাদ বা লেখা আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে, কোন পরিস্থিতিতে মামলা, জেল বা জরিমানার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আইনগত সীমাবদ্ধতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি আলোচনা করেন।
তিনি সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, বাংলাদেশের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম তুলে ধরেন তিনি।
সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময়ে হামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণ এবং কোন ধরনের সংবাদ বা লেখাকে কেন্দ্র করে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়েও বক্তব্য দেন মোঃ খায়রুল আলম রফিক।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মেধা ও দক্ষতাকে ইতিবাচক ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের আইন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বা গোপনীয় তথ্য অপ্রয়োজনে প্রকাশ কিংবা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মানবাধিকার ও পেশাগত দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি সাংবাদিকদের দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। এ সময় তথ্য কর্মকর্তার উদ্দেশে তিনি বলেন, “তথ্য কর্মকর্তা সাংবাদিকের বন্ধু।” এর মাধ্যমে সাংবাদিক ও সরকারি তথ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত সহযোগিতা ও সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে যাচাই ছাড়া কোনো মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ বা ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করা উচিত। তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করলে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
এ সময় সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে সময় দেওয়া এবং ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তথ্য কর্মকর্তা। তিনি সাংবাদিকদের পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান।
সহনশীলতার অভাব থেকে সাংবাদিকদের মধ্যে অনেক সময় বিরূপ মনোভাব ও হিংসা তৈরি হয় উল্লেখ করে তিনি এসব পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বজায় রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি সাংবাদিকদের মাদক থেকে দূরে থাকা, ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নারীসংক্রান্ত অনৈতিক বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ভুল, ভুয়া বা মনগড়া তথ্য প্রচার না করার পরামর্শ দেন।
সভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এর সঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও জড়িত। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান, আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং পেশাগত নৈতিকতা অনুসরণ করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি (পিপিএম), মোঃ আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, মোহাম্মদ আলী আবির ও সিয়াম রশিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথি ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম সানু।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংবাদকর্মীরা সভায় অংশ নেন।
সভায় সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনগত সচেতনতা, পারস্পরিক ঐক্য এবং সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।