• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
২ বছরের পথচলা, এবার প্রকাশ্যে মানবসেবায় হাতিয়া যুব প্রচেষ্টা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল ২০ টাকা: আসলে দায় কার সরকার, নাকি আন্তর্জাতিক বাজার? গোপালগঞ্জ ঢাকা- যশোর মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় অজ্ঞাত বৃদ্ধ নিহত ভারতে সাজা ভোগ শেষে রৌমারী সীমান্ত দিয়ে দুই বাংলাদেশির প্রত্যাবাসন গোপালগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গৃহবধূর মৃত্যু ভারতে প্রায় ৩ বছর কারাভোগ, ভূরুঙ্গামারী দিয়ে ফিরলেন ১ নারীসহ তিন বাংলাদেশি কুড়িগ্রামে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধ নিহত, অভিযুক্ত আটক ঢাকায় গ্রিন লাইফ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের জেলা কমিটি প্রকাশ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার নব-নির্বাচিত,সভাপতি ডাঃ মাহফুজুর রহমান মারুফ ধরলা সেতুতে বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল ২০ টাকা: আসলে দায় কার সরকার, নাকি আন্তর্জাতিক বাজার?

নিজস্ব প্রতিবেদন / ১০ Time View
Update : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের বাজারে এক লাফে সব প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।

হঠাৎ করে এমন বড় মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর জন্য দায়ী কে? সরকার, নাকি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা?

তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো একক কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ, দেশে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল লোকসান সব মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি সরকারেরই।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের আমদানি ব্যয়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ও ঝুঁকি বাড়ায় তেলের পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও তেল সরবরাহের বিঘ্ন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামও ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশ যে দামে বিদেশ থেকে জ্বালানি কিনছে, সেই ব্যয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িত না হলেও দেশটির জ্বালানি বাজার আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তেল উৎপাদন ও পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে বীমা ও ফ্রেইট ব্যয়ও বাড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই বাংলাদেশ প্রায় ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি বড় ধাক্কা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিপিসির লোকসান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে জ্বালানি কিনে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান দ্রুত বেড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু মার্চ থেকে জুন চার মাসে বিপিসির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি আমদানির এলসি খোলার সক্ষমতা বজায় রাখতে সরকারের কাছে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ সহায়তাও চেয়েছিল।

আর সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিপিসির মোট লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ দীর্ঘদিন দেশের ভোক্তার ওপর না দেওয়ায় বিপিসিকে বড় অঙ্কের লোকসান বহন করতে হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেও দেশে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা ও কেরোসিন ১৩৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছিল। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর টানা কয়েক মাস এই দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ থাকা সত্ত্বেও প্রতিমাসে তার পুরোটা দেশের বাজারে সমন্বয় করা হয়নি।

এর ফলে একদিকে সাধারণ ভোক্তা কিছুটা সময় কম দামে জ্বালানি পেয়েছেন, অন্যদিকে বিপিসির ওপর লোকসানের চাপ জমেছে। শেষ পর্যন্ত সেই আর্থিক চাপ কমাতে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক ও কর, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট এবং বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের বাজারে একই হারে দাম বাড়বে এমন বাধ্যবাধকতা নেই; সরকার মূল্য পর্যালোচনার পর আগের দামও বহাল রাখতে পারে।

তাই ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও, কতটা বাড়ানো হবে সেটি শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির লোকসান দ্রুত বাড়ছে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা লক্ষ্য।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২৮.৭৬ বিলিয়ন টাকা লোকসান হয়েছে। সরকার আশা করছে, নতুন দাম কার্যকর হলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০০ বিলিয়ন টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে।

এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তুলনামূলক সস্তা থাকলে সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে সরকার যুক্তি দিয়েছে।

সরকারের ব্যাখ্যায় আন্তর্জাতিক বাজার ও বিপিসির লোকসানের বিষয়টি সামনে এলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানি ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি → পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি → বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ।

বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। কারণ বাংলাদেশে মোট জ্বালানি তেল ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৬ শতাংশ ডিজেল।

ফলে বাস, ট্রাক, কৃষিযন্ত্র, শিল্প ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে।

তথ্যগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি দুই ভাগে দেখা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

দেশের বাজারে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির কতটা চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া হবে এবং কতটা সরকার বা বিপিসি বহন করবে সেটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। বর্তমান ক্ষেত্রে সরকার ভোক্তা পর্যায়ে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে।

অতএব, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত কিংবা শুধু আন্তর্জাতিক বাজার কোনো একটির ফল হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা পাওয়া যাবে না।

আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করেছে মূল চাপ; বিপিসির লোকসান সেই চাপকে দেশের ভেতরে আরও তীব্র করেছে; আর সেই চাপের একটি বড় অংশ ভোক্তার ওপর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও কমার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বাজারেও দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উঁচু থাকলে দেশের জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে এশিয়ার তেল ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক দামের বিষয়ে উচ্চ ঝুঁকি দেখছেন।

জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানোর ঘটনাকে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিপিসির বিপুল লোকসান।

তবে এটিও সত্য সাধারণ মানুষের ওপর এই বাড়তি চাপ কতটা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।

তাই প্রশ্নটি শুধু ‘তেলের দাম কেন বাড়ল?’ নয়; বরং বড় প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক সংকটের কতটা বোঝা সাধারণ মানুষ বহন করবে, আর কতটা রাষ্ট্রীয়ভাবে সামাল দেওয়া হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category