মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের নামে করা ‘শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ড’-এর ব্যানার সরিয়ে ফেলার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানিয়েছে, স্ট্যান্ডটির নাম পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বোর্ডের দাবি, এ সংক্রান্ত প্রচারিত তথ্য ‘ভিত্তিহীন’।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে একটি পোস্টে দাবি করেন, তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বিসিবি আবু সাঈদের নামে করা গ্যালারির ব্যানার সরিয়ে দিয়েছে।
তিনি লেখেন, ‘৫ আগস্টের পর শহীদ আবু সাঈদের সম্মানে মিরপুর স্টেডিয়ামে একটি গ্যালারির নামকরণ করেছিলাম আমরা। নতুন সরকারের অবৈধ বিসিবি প্রেসিডেন্ট সেটা অপসারণ করেছে।’
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে একের পর এক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অনেকে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে একই সময়ে আবু সাঈদ স্ট্যান্ডের ব্যানার আগের জায়গায় থাকার একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে দাবি ওঠে, বৃষ্টিতে ব্যানারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নতুন ব্যানার লাগানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং সমালোচনা শুরুর পর সেটি আবার লাগানো হয়েছে।
তবে ব্যানার সরানো বা নতুন করে লাগানোর—দুই দাবিই নাকচ করেছেন বিসিবি পরিচালক সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর।
তিনি বলেন, ‘এটা (আবু সাঈদ স্ট্যান্ডের ব্যানার) এখন স্বশরীরে গিয়ে দেখা উচিত। এটা সরানো হয়নি।’
ব্যানারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে নতুন করে লাগানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু আমার জানা নেই। ওটা সরানোই হয়নি। আর এটা সরানো হয়েছে বা সরানো হবে—এমন কিছুও শুনিনি আমি। এ ধরনের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। আমি গতকালকও গিয়ে দেখলাম, ওটা ওখানেই আছে। আরও সংস্কার করার কথা বলছে, কাজ শুরু করছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে দেখছেন বিসিবির এই পরিচালক। তাঁর ভাষায়, ‘এটা তো সরানো সম্ভব না। এই যে প্রোপাগান্ডা যেভাবে ছড়ায় তারা, এটা তো খুবই অস্বাভাবিক। কালকে একজন পোস্ট দেওয়ার পরে দেখলাম আরও ১৫টা পোস্ট আসছে কয়েক মিনিটের ভেতরে।’
বিসিবির আনুষ্ঠানিক অবস্থান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে বিসিবি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এমন সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে যে, বর্তমান বোর্ড প্রশাসন মিরপুর জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের নামে নামকরণ করা ‘শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ড’ বাতিল করেছে।
বিসিবি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম কিংবা দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুতে ‘শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ড’সহ কোনো স্ট্যান্ডের নাম পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে বোর্ড কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বোর্ড আরও জানায়, আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচের সময় অফিসিয়াল স্ট্যান্ডগুলোর নাম স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা হয়। চলতি বছরের শুরুতে বর্তমান বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত তিনটি আন্তর্জাতিক সিরিজেও ‘শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ড’সহ অন্যান্য স্ট্যান্ডের নাম দর্শক ও টেলিভিশন সম্প্রচারে দৃশ্যমান ছিল। ম্যাচের টিকিট ও প্রচারণামূলক উপকরণেও স্ট্যান্ডগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে
বিসিবি জানিয়েছে, স্টেডিয়ামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্ট্যান্ডের নাম সংবলিত সাইনবোর্ড বা সাইনেজ কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজ সাধারণত ম্যাচ না থাকার দিনগুলোতেই করা হয়।
বিসিবির দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ত্যাগ ও অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর নামে স্ট্যান্ডটির নামকরণ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ নেই।
বোর্ড আরও বলেছে, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও মিথ্যা বক্তব্য ছড়িয়ে বর্তমান বোর্ড এবং বিসিবির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ‘পরিকল্পিত চেষ্টা’ করা হচ্ছে। এ ধরনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে নিজেদের নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও সংরক্ষণ করেছে বিসিবি।
সারকথা: এখন পর্যন্ত বিসিবির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং পরিচালক সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী, মিরপুর স্টেডিয়ামের ‘শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ড’ বাতিল বা সরিয়ে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সঙ্গে বিসিবির বক্তব্যের মিল নেই।