ফ্যাসিবাদী কোনো ব্যক্তি বা দল ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ। তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন রূপে সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিরে আসতে পারে। তাই শুধু একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পরাজয় নয়, ফ্যাসিবাদের জন্ম ও বিকাশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
শারমিন এস মুরশেদ বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি কারা এবং তাদের একটি সামাজিক মানচিত্র আমাদের কাছে আছে কি না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। কারণ, এত বড় একটি অপশক্তিকে পরাজিত করে দেশকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এই শক্তির কারণেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে, যখন অনৈক্যকে জয় করে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং বড় বিজয় অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার অন্যতম উদাহরণ। সারা দেশের মানুষের ঐক্যের কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ওই সময় সারা দেশ একতার শক্তিতে একটি ঐক্য তৈরি করেছিল। এটি ছিল এক ধরনের ‘দৈব শক্তি’, যা দেশের মানুষকে একত্রিত করেছিল। একটি দেশে বড় পরিবর্তন আনতে ‘কালেক্টিভ পাওয়ার’ বা সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজন হয়। জুলাই আন্দোলনে তিনি সেই শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ দেখেছেন।
শারমিন এস মুরশেদ আরও বলেন, স্বৈরশাসন বাংলাদেশের কী ধরনের ক্ষতি করেছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী—এসব বিষয় নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। শুধু কোনো সম্মেলনে ১৫০-২০০ জন মানুষ উপস্থিত হলেই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই একমত হয়ে গেলেন—বিষয়টি এমন নয়। এ নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন সবাইকে একটি মৌলিক ঐকমত্যের জায়গায় দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সেই ঐক্য এতটা শক্তিশালী হয়নি যে তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি ন্যূনতম সার্বিক ঐকমত্য।
আগামীর বাংলাদেশের জন্য সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন একটি জায়গায় অবস্থান নিতে হবে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলই অস্বীকার করতে পারবে না যে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি সনদের কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সনদের বিভিন্ন ধারায় বাংলাদেশের ৫৪ বছরের বঞ্চনার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। শুধু একটি রেজিমের কারণে নয়, দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও সংকট পেরিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্যের জায়গায় পৌঁছানো প্রয়োজন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী। এতে সংগঠনটির উপদেষ্টা ডিউক হুদা, ড. ফয়জুল হক, লে. কর্নেল ফেরদৌস আজিজ ও শেখ মহিউদ্দিন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।